মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), সৌদি আরব বা কাতারের মতো দেশ পর্যটন বাণিজ্যে রমরমা সময় পার করছে। একই পথে হাঁটতে চায় যুদ্ধবিধ্বস্ত লেবাননও। ২০১৯ সাল থেকে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পর্যটন খাতের ওপর ভরসা করছে দেশটি। যার প্রধান লক্ষ্য আন্তর্জাতিক ও উপসাগরীয় দেশগুলোর পর্যটকরা। খবর আরব নিউজ।
লেবাননের পর্যটন খাতে সরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ একদমই সামান্য। বরং এখানকার হালনাগাদ বিনোদন পুরোপুরি বেসরকারি পর্যায়ের উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল। দেশটির রাজধানী বৈরুতের ক্লাব ও রেস্তোরাঁগুলোয় ডলারে লেনদেন ক্রমেই বাড়ছে। যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এখনকার বাড়বাড়ন্ত রাত্রিকালীন পর্যটন নাজুক হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু এখন এটি লেবাননের ভঙ্গুর অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠেছে।
লেবাননের সর্বশেষ আর্থিক ধস টানা ষষ্ঠ বছরে পা দিয়েছে, যা দেশটির ব্যাংক খাতে ৮০ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি তৈরি করেছে, রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে ঋণ পুনর্গঠনও থমকে আছে। ২০১৯ সালের পর থেকে বিনিময় মান ৯০ শতাংশের বেশি হারিয়েছে লেবানিজ পাউন্ড। অন্যদিকে দেশটির জিডিপি প্রায় ৪০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।
২০২৪ সালের হিজবুল্লাহ-ইসরায়েল সংঘাত লেবাননের অর্থনীতিতে ধস নামে। পর্যটন কেন্দ্রগুলোর বড় আকারের ক্ষতি হয়েছে। বিশ্বব্যাংক দেশটির ১০০ কোটি ডলারের পুনরুদ্ধার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, যার অংশ হিসেবে গত মাসে ২৫ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুসারে, এ সংঘাতে লেবাননের মোট ক্ষতি হয়েছে ৭২০ কোটি ডলার। আর পুনর্গঠনে প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।
সত্তরের দশককে লেবানিজ পর্যটনের স্বর্ণযুগ ধরা হয়। ওই সময় উপসাগরীয় দেশগুলোর পর্যটকে ভরে যেত লেবাননের সৈকত, পাহাড়ি রিসোর্ট এবং জমজমাট ছিল নৈশকালীন আয়োজন। অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সাম্প্রতিক প্রক্রিয়ায় সে স্মৃতি নতুন প্রজন্মের অভিজাত পর্যটকদের কাছে ফিরিয়ে আনতে কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গত মাসে ‘রেট্রো’ থিমের এক অনুষ্ঠানে বৈরুতের আইকনিক সেন্ট জর্জ হোটেলের আকাশে আতশবাজির ঝলক দেখা যায়। এটি আয়োজন করেছিল দেশটির পর্যটন মন্ত্রণালয়।
লেবাননের পর্যটন এলাকায় সেনাবাহিনীর টহল বেড়েছে। বিমানবন্দরের সড়ক ধরে এগোলে একসময় হিজবুল্লাহর ব্যানার দেখা যেত। এখন সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে ‘লেবাননের নতুন যুগ’ লেখা বিলবোর্ড।
সম্প্রতি লেবাননের ওপর সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। সৌদি আরবও শিগগিরই তা করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিলাসবহুল পর্যটনকে ঘিরে উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেড়েছে লেবাননে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা স্বীকার করে লেবাননের পর্যটনমন্ত্রী লরা লাহুদ বলেন, ‘পুরো অঞ্চল যেমন প্রভাবিত হচ্ছে, আমরাও তেমনি হচ্ছি। তবে লেবানন যদি নিরপেক্ষ থাকে এবং কোনো পক্ষ না নেয়, যেমন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী বলে যাচ্ছেন; তাহলে আমরা এ মৌসুম বাঁচাতে পারব।’
অবশ্য এ আশাবাদী মনোভাব নির্ভর করছে ইরান-ইসরায়েল সাময়িক অস্ত্রবিরতির ওপর। লরা লাহুদ বলেন, ‘আশা করছি, সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’
মূলত ডলারে লেনদেনকারী বেসরকারি বিনিয়োগকারীরাই বিলাসবহুল পর্যটনের জোয়ার বইয়ে দিচ্ছেন লেবাননে। বিচ ক্লাব, রুফটপ লাউঞ্জ বা ভিআইপি এক্সপেরিয়েন্সসহ নানা খাতে আসছেন উদ্যোক্তারা। লেবাননের পর্যটনমন্ত্রী লরা লাহুদ বলেন, ‘বেসরকারি খাত সবসময়ই প্রধান চালক ছিল। আমাদের কাজ হচ্ছে পথ দেখানো, সংগঠিত করা এবং নতুন খাত, নতুন অঞ্চল ও নতুন ধরনের বিনিয়োগ নির্দেশনা দেয়া।’
তবে অনেকেই বলছেন, লেবাননের পর্যটন খাত নিয়ে চলমান মডেল টেকসই নয়। অর্থনীতিবিদ ও লেবানিজ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জাসেম আজাকার মতে, ‘ডলারভিত্তিক পর্যটন দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। স্থানীয়দের জন্য সেবার দাম অনেক বেড়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে যদি পর্যটক ও স্থানীয়দের জন্য কোনো সেবার দাম একই রকম রাখা হয়। এটি টেকসই নয়, কারণ ডলার লেবাননের আনুষ্ঠানিক মুদ্রা নয়।’